১০:০৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সরকারি পদে থেকে নিজ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এলজিইডিতে জনবল সরবরাহের অভিযোগ।

প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেনকে ঘিরে প্রশ্নের পর প্রশ্ন, অনুসন্ধানে মিলেছে সরকারি বিধি ও ব্যবসায়িক স্বার্থের সংঘাতের তথ্য৷

  • প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০১:৩৭:৩২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬
  • ৯৮ বার পড়া হয়েছে

corruption of belal hossain

১১৯

সরকারি পদে থেকে নিজ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এলজিইডিতে জনবল সরবরাহের অভিযোগ।

 

বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর—এলজিইডির বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী মোঃ বেলাল হোসেনকে ঘিরে উঠেছে গুরুতর অনিয়ম, স্বার্থের সংঘাত এবং আউটসোর্সিং ব্যবসার অভিযোগ। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য ও সংশ্লিষ্ট নথি বিশ্লেষণে এমন কিছু প্রশ্ন সামনে এসেছে, যার উত্তর শুধু এলজিইডি নয়, সংশ্লিষ্ট সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কাছ থেকেও পাওয়া জরুরি।

অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর দিক হলো—সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করা অবস্থায় বেলাল হোসেনের নামে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এলজিইডির বিভিন্ন প্রকল্পে জনবল সরবরাহের ব্যবসা পরিচালিত হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
সরকারি কর্মচারী হিসেবে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি চাকরিবিধির বিধিনিষেধ রয়েছে। অথচ অভিযোগ অনুযায়ী, এলজিইডির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রশাসন) হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় থেকেই বেলাল হোসেনের সংশ্লিষ্টতা থাকা একটি প্রতিষ্ঠান এলজিইডির বিভিন্ন প্রকল্পে জনবল সরবরাহের কাজে যুক্ত হয়।

এলকেএসএস হিউম্যান রিসোর্স সেন্টার: সমিতি থেকে ব্যক্তি মালিকানা?
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এলজিইডির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমবায় সমিতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলকেএসএস হিউম্যান রিসোর্স সেন্টার বিভিন্ন প্রকল্পে জনবল নিয়োগ ও সরবরাহের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটি লিমিটেড কোম্পানি ক্যাটাগরিতে থাকলেও পরবর্তীতে ব্যক্তি মালিকানায় রূপান্তরের তথ্য পাওয়া যায়। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২২, ২০২৩, ২০২৪, ২০২৫ এবং ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে প্রতিষ্ঠানটির ট্রেড লাইসেন্সের একক মালিক হিসেবে মোঃ বেলাল হোসেনের নাম ছিল।
উল্লেখিত ট্রেড লাইসেন্স নম্বর: ৎধফ/ফহপপ/০০৩৬০৭/২০২১।

এখানেই তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—
একজন কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা, যিনি একই অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও প্রকৌশল দায়িত্বে ছিলেন, তিনি কীভাবে একই অধিদপ্তরের প্রকল্পে জনবল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মালিক হিসেবে ব্যবসা পরিচালনা করলেন?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
কলকারখানা অধিদপ্তরের চিঠিতে উঠেছে সরকারি চাকরিবিধির প্রশ্ন
বিষয়টি শুধু অভিযোগের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই। ২৩ জুন ২০২৬ তারিখে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের যুগ্ম মহাপরিদর্শক মোঃ মাহফুজুর রহমান ভূঁইয়ার স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে মোঃ বেলাল হোসেনের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
চিঠিতে মূলত জানতে চাওয়া হয়—সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা অনুযায়ী একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তিনি ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন কি না। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা পরিবর্তনের বিষয়টি কেন সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো হয়নি, সে বিষয়েও যথাযথ ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, একজন সরকারি কর্মকর্তার ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্নটি এখন সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের নথিতেও প্রতিফলিত হয়েছে।

“জি” শ্রেণির লাইসেন্স ছাড়াই জনবল সরবরাহের অভিযোগ
আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, জনবল সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও লাইসেন্সের শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, এলকেএসএস হিউম্যান রিসোর্স সেন্টার ট্রেড লাইসেন্সের ভিত্তিতে জনবল সরবরাহের কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। কিন্তু এ ধরনের ব্যবসা পরিচালনার জন্য কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট লাইসেন্সের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কি না এবং সেই লাইসেন্স ছাড়া কীভাবে এত বড় পরিসরে জনবল সরবরাহ করা হলো—এ প্রশ্নেরও তদন্ত প্রয়োজন।
প্রায় ৬৫০০ জন জনবল, কোটি কোটি টাকার হিসাব
অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে দাবি করা হচ্ছে, বিভিন্ন সময়ে এলকেএসএসের মাধ্যমে এলজিইডির বিভিন্ন প্রকল্পে প্রায় ৬৫০০ জন জনবল নিয়োগ বা সরবরাহ করা হয়েছে।
এত বিপুল সংখ্যক মানুষের চাকরি ও বেতন-ভাতার সঙ্গে যুক্ত একটি আউটসোর্সিং ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক লেনদেনও স্বাভাবিকভাবেই বিপুল।
অভিযোগ রয়েছে, কর্মীদের বেতন থেকে নিয়ম অনুযায়ী টিআইএন ও ভ্যাট-সংক্রান্ত অর্থ কর্তন করা হলেও তার একটি অংশ সরকারি কোষাগারে যথাযথভাবে জমা হয়নি। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এর পরিমাণ প্রায় ২০ কোটি টাকা হতে পারে। তবে এই অর্থের প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণে এলজিইডি, কর কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবের পূর্ণাঙ্গ অডিট প্রয়োজন।

এখানে প্রশ্ন একাধিক—
কত টাকা কর্তন করা হয়েছে?
কত টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে?
কত টাকা জমা হয়নি?
কার নির্দেশে বা কার তত্ত্বাবধানে এই অর্থ ব্যবস্থাপনা হয়েছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর বেরিয়ে এলেই প্রকৃত চিত্র পরিষ্কার হবে।
কর্মীদের এক মাসের বেতন জমার বিধান নিয়েও প্রশ্ন
আউটসোর্সিং ব্যবস্থায় নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট নিয়মে অর্থ কর্তন করে এলজিইডি ও কলকারখানা অধিদপ্তরের যৌথ ব্যাংক হিসাবে সংরক্ষণের বিধান থাকার কথা বলা হচ্ছে। চাকরির মেয়াদ শেষে সংশ্লিষ্ট কর্মীকে সেই অর্থ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
যদি সত্যিই এ বিধান কার্যকর থাকার পরও হাজার হাজার কর্মীর কাছ থেকে কর্তন করা অর্থ নির্ধারিত হিসাবে জমা না হয়ে থাকে, তাহলে সেটি শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়—এর সঙ্গে জড়িত অর্থের হিসাব, দায়ী ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা তদন্ত করা অত্যন্ত জরুরি।
প্রধান প্রকৌশলীর পদ কি ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার?

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখানেই।
একদিকে মোঃ বেলাল হোসেন এলজিইডির সর্বোচ্চ প্রকৌশল প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে তাঁর নামে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের এলজিইডির প্রকল্পে জনবল সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে।
যদি নথিপত্রের মাধ্যমে এই অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে এটি সম্ভাব্য conflict of interest বা স্বার্থের সংঘাতের একটি গুরুতর উদাহরণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
একজন সরকারি কর্মকর্তার দায়িত্ব হচ্ছে সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষা করা। কিন্তু একই কর্মকর্তা যদি সেই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসায়িক লেনদেনে যুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিক বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হন, তাহলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিরপেক্ষতা নিয়েই স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে।

তদন্ত হওয়া জরুরি
এলজিইডির মতো দেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে হলে প্রয়োজন স্বাধীন ও নথিভিত্তিক তদন্ত।
বিশেষ করে—
১. মোঃ বেলাল হোসেনের নামে থাকা ট্রেড লাইসেন্সের প্রকৃত মালিকানা ও মেয়াদ যাচাই;
২. তিনি সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় ব্যবসা পরিচালনা করেছেন কি না তা নির্ধারণ;
৩. এলকেএসএস হিউম্যান রিসোর্স সেন্টারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের প্রকৃতি যাচাই;
৪. এলজিইডির কোন কোন প্রকল্পে প্রতিষ্ঠানটি জনবল সরবরাহ করেছে তার পূর্ণ তালিকা প্রকাশ;
৫. নিয়োগপ্রাপ্ত প্রায় ৬৫০০ জন কর্মীর বেতন ও কর্তনের পূর্ণাঙ্গ হিসাব নিরীক্ষা;
৬. টিআইএন, ভ্যাট ও অন্যান্য সরকারি পাওনা যথাযথভাবে জমা হয়েছে কি না তা যাচাই;
৭. যৌথ ব্যাংক হিসাবে কর্মীদের প্রাপ্য অর্থ জমা হয়েছে কি না তা পরীক্ষা;
৮. এলজিইডির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের চুক্তি, বিল, ভাউচার ও ব্যাংক লেনদেন পর্যালোচনা;
৯. সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা লঙ্ঘনের কোনো ঘটনা ঘটেছে কি না তা নির্ধারণ;
১০. ২৩ জুন ২০২৬-এর চিঠির পর বেলাল হোসেন কী জবাব দিয়েছেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছে তা প্রকাশ করা।

প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
কারণ এখানে শুধু একজন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়—প্রশ্ন উঠেছে সরকারি ক্ষমতা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থের সম্ভাব্য সংঘাত নিয়ে।
অভিযোগগুলোর সত্যতা যদি তদন্তে প্রমাণিত হয়, তাহলে তা এলজিইডির প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জন্য অত্যন্ত গুরুতর ঘটনা হবে। আর অভিযোগগুলো যদি অসত্য হয়, তাহলেও নথিপত্র প্রকাশ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রধান প্রকৌশলী মোঃ বেলাল হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা প্রশ্নগুলোর নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।
এখন দেখার বিষয়—সরকার ও সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থাগুলো কি এই অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করবে, নাকি এলজিইডির ক্ষমতাধর মহলের প্রভাবেই বিষয়টি চাপা পড়ে যাবে?

পরবর্তী পর্বে: এলকেএসএসের মাধ্যমে জনবল সরবরাহের চুক্তি, প্রকল্পভিত্তিক অর্থের হিসাব এবং ৬৫০০ কর্মীর বেতন থেকে কর্তন করা অর্থের গন্তব্য—নথি বিশ্লেষণে উঠে আসছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য।

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ওয়েবসাইট

আপলোডকারীর তথ্য

MAHMUDUR RASHID

Mahmudur Radlshid serves as the Executive Editor of newsbanglabd24.com, steering the organization’s editorial vision with a sharp focus on political accountability, governance, and public-interest journalism. A seasoned newsroom strategist and political journalist, he is known for his uncompromising editorial judgment and commitment to exposing facts that shape national discourse. Under his leadership, the newsroom prioritizes investigative reporting, data-driven analysis, and ground-level political coverage that challenges power structures and amplifies public voice. He has built a reputation for maintaining editorial independence in high-pressure environments, ensuring that reporting remains factual, balanced, and resistant to external influence. His editorial direction emphasizes courage in reporting, accuracy in verification, and clarity in public communication. As Executive Editor, he oversees all editorial operations, including political desk strategy, investigative assignments, and content integrity. He actively mentors journalists within the organization, fostering a newsroom culture rooted in professional rigor, ethical responsibility, and investigative depth. Through newsbanglabd24.com, he continues to advance a journalism model centered on transparency, accountability, and fearless reporting in the public interest.
জনপ্রিয় সংবাদ

প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেনকে ঘিরে প্রশ্নের পর প্রশ্ন, অনুসন্ধানে মিলেছে সরকারি বিধি ও ব্যবসায়িক স্বার্থের সংঘাতের তথ্য৷

Verified by MonsterInsights

সরকারি পদে থেকে নিজ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এলজিইডিতে জনবল সরবরাহের অভিযোগ।

প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেনকে ঘিরে প্রশ্নের পর প্রশ্ন, অনুসন্ধানে মিলেছে সরকারি বিধি ও ব্যবসায়িক স্বার্থের সংঘাতের তথ্য৷

আপডেট সময় : ০১:৩৭:৩২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬
১১৯

সরকারি পদে থেকে নিজ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এলজিইডিতে জনবল সরবরাহের অভিযোগ।

 

বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর—এলজিইডির বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী মোঃ বেলাল হোসেনকে ঘিরে উঠেছে গুরুতর অনিয়ম, স্বার্থের সংঘাত এবং আউটসোর্সিং ব্যবসার অভিযোগ। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য ও সংশ্লিষ্ট নথি বিশ্লেষণে এমন কিছু প্রশ্ন সামনে এসেছে, যার উত্তর শুধু এলজিইডি নয়, সংশ্লিষ্ট সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কাছ থেকেও পাওয়া জরুরি।

অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর দিক হলো—সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করা অবস্থায় বেলাল হোসেনের নামে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এলজিইডির বিভিন্ন প্রকল্পে জনবল সরবরাহের ব্যবসা পরিচালিত হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
সরকারি কর্মচারী হিসেবে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি চাকরিবিধির বিধিনিষেধ রয়েছে। অথচ অভিযোগ অনুযায়ী, এলজিইডির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রশাসন) হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় থেকেই বেলাল হোসেনের সংশ্লিষ্টতা থাকা একটি প্রতিষ্ঠান এলজিইডির বিভিন্ন প্রকল্পে জনবল সরবরাহের কাজে যুক্ত হয়।

এলকেএসএস হিউম্যান রিসোর্স সেন্টার: সমিতি থেকে ব্যক্তি মালিকানা?
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এলজিইডির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমবায় সমিতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলকেএসএস হিউম্যান রিসোর্স সেন্টার বিভিন্ন প্রকল্পে জনবল নিয়োগ ও সরবরাহের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটি লিমিটেড কোম্পানি ক্যাটাগরিতে থাকলেও পরবর্তীতে ব্যক্তি মালিকানায় রূপান্তরের তথ্য পাওয়া যায়। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২২, ২০২৩, ২০২৪, ২০২৫ এবং ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে প্রতিষ্ঠানটির ট্রেড লাইসেন্সের একক মালিক হিসেবে মোঃ বেলাল হোসেনের নাম ছিল।
উল্লেখিত ট্রেড লাইসেন্স নম্বর: ৎধফ/ফহপপ/০০৩৬০৭/২০২১।

এখানেই তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—
একজন কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা, যিনি একই অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও প্রকৌশল দায়িত্বে ছিলেন, তিনি কীভাবে একই অধিদপ্তরের প্রকল্পে জনবল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মালিক হিসেবে ব্যবসা পরিচালনা করলেন?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
কলকারখানা অধিদপ্তরের চিঠিতে উঠেছে সরকারি চাকরিবিধির প্রশ্ন
বিষয়টি শুধু অভিযোগের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই। ২৩ জুন ২০২৬ তারিখে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের যুগ্ম মহাপরিদর্শক মোঃ মাহফুজুর রহমান ভূঁইয়ার স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে মোঃ বেলাল হোসেনের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
চিঠিতে মূলত জানতে চাওয়া হয়—সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা অনুযায়ী একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তিনি ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন কি না। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা পরিবর্তনের বিষয়টি কেন সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো হয়নি, সে বিষয়েও যথাযথ ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, একজন সরকারি কর্মকর্তার ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্নটি এখন সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের নথিতেও প্রতিফলিত হয়েছে।

“জি” শ্রেণির লাইসেন্স ছাড়াই জনবল সরবরাহের অভিযোগ
আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, জনবল সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও লাইসেন্সের শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, এলকেএসএস হিউম্যান রিসোর্স সেন্টার ট্রেড লাইসেন্সের ভিত্তিতে জনবল সরবরাহের কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। কিন্তু এ ধরনের ব্যবসা পরিচালনার জন্য কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট লাইসেন্সের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কি না এবং সেই লাইসেন্স ছাড়া কীভাবে এত বড় পরিসরে জনবল সরবরাহ করা হলো—এ প্রশ্নেরও তদন্ত প্রয়োজন।
প্রায় ৬৫০০ জন জনবল, কোটি কোটি টাকার হিসাব
অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে দাবি করা হচ্ছে, বিভিন্ন সময়ে এলকেএসএসের মাধ্যমে এলজিইডির বিভিন্ন প্রকল্পে প্রায় ৬৫০০ জন জনবল নিয়োগ বা সরবরাহ করা হয়েছে।
এত বিপুল সংখ্যক মানুষের চাকরি ও বেতন-ভাতার সঙ্গে যুক্ত একটি আউটসোর্সিং ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক লেনদেনও স্বাভাবিকভাবেই বিপুল।
অভিযোগ রয়েছে, কর্মীদের বেতন থেকে নিয়ম অনুযায়ী টিআইএন ও ভ্যাট-সংক্রান্ত অর্থ কর্তন করা হলেও তার একটি অংশ সরকারি কোষাগারে যথাযথভাবে জমা হয়নি। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এর পরিমাণ প্রায় ২০ কোটি টাকা হতে পারে। তবে এই অর্থের প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণে এলজিইডি, কর কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবের পূর্ণাঙ্গ অডিট প্রয়োজন।

এখানে প্রশ্ন একাধিক—
কত টাকা কর্তন করা হয়েছে?
কত টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে?
কত টাকা জমা হয়নি?
কার নির্দেশে বা কার তত্ত্বাবধানে এই অর্থ ব্যবস্থাপনা হয়েছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর বেরিয়ে এলেই প্রকৃত চিত্র পরিষ্কার হবে।
কর্মীদের এক মাসের বেতন জমার বিধান নিয়েও প্রশ্ন
আউটসোর্সিং ব্যবস্থায় নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট নিয়মে অর্থ কর্তন করে এলজিইডি ও কলকারখানা অধিদপ্তরের যৌথ ব্যাংক হিসাবে সংরক্ষণের বিধান থাকার কথা বলা হচ্ছে। চাকরির মেয়াদ শেষে সংশ্লিষ্ট কর্মীকে সেই অর্থ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
যদি সত্যিই এ বিধান কার্যকর থাকার পরও হাজার হাজার কর্মীর কাছ থেকে কর্তন করা অর্থ নির্ধারিত হিসাবে জমা না হয়ে থাকে, তাহলে সেটি শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়—এর সঙ্গে জড়িত অর্থের হিসাব, দায়ী ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা তদন্ত করা অত্যন্ত জরুরি।
প্রধান প্রকৌশলীর পদ কি ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার?

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখানেই।
একদিকে মোঃ বেলাল হোসেন এলজিইডির সর্বোচ্চ প্রকৌশল প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে তাঁর নামে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের এলজিইডির প্রকল্পে জনবল সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে।
যদি নথিপত্রের মাধ্যমে এই অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে এটি সম্ভাব্য conflict of interest বা স্বার্থের সংঘাতের একটি গুরুতর উদাহরণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
একজন সরকারি কর্মকর্তার দায়িত্ব হচ্ছে সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষা করা। কিন্তু একই কর্মকর্তা যদি সেই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসায়িক লেনদেনে যুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিক বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হন, তাহলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিরপেক্ষতা নিয়েই স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে।

তদন্ত হওয়া জরুরি
এলজিইডির মতো দেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে হলে প্রয়োজন স্বাধীন ও নথিভিত্তিক তদন্ত।
বিশেষ করে—
১. মোঃ বেলাল হোসেনের নামে থাকা ট্রেড লাইসেন্সের প্রকৃত মালিকানা ও মেয়াদ যাচাই;
২. তিনি সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় ব্যবসা পরিচালনা করেছেন কি না তা নির্ধারণ;
৩. এলকেএসএস হিউম্যান রিসোর্স সেন্টারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের প্রকৃতি যাচাই;
৪. এলজিইডির কোন কোন প্রকল্পে প্রতিষ্ঠানটি জনবল সরবরাহ করেছে তার পূর্ণ তালিকা প্রকাশ;
৫. নিয়োগপ্রাপ্ত প্রায় ৬৫০০ জন কর্মীর বেতন ও কর্তনের পূর্ণাঙ্গ হিসাব নিরীক্ষা;
৬. টিআইএন, ভ্যাট ও অন্যান্য সরকারি পাওনা যথাযথভাবে জমা হয়েছে কি না তা যাচাই;
৭. যৌথ ব্যাংক হিসাবে কর্মীদের প্রাপ্য অর্থ জমা হয়েছে কি না তা পরীক্ষা;
৮. এলজিইডির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের চুক্তি, বিল, ভাউচার ও ব্যাংক লেনদেন পর্যালোচনা;
৯. সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা লঙ্ঘনের কোনো ঘটনা ঘটেছে কি না তা নির্ধারণ;
১০. ২৩ জুন ২০২৬-এর চিঠির পর বেলাল হোসেন কী জবাব দিয়েছেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছে তা প্রকাশ করা।

প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
কারণ এখানে শুধু একজন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়—প্রশ্ন উঠেছে সরকারি ক্ষমতা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থের সম্ভাব্য সংঘাত নিয়ে।
অভিযোগগুলোর সত্যতা যদি তদন্তে প্রমাণিত হয়, তাহলে তা এলজিইডির প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জন্য অত্যন্ত গুরুতর ঘটনা হবে। আর অভিযোগগুলো যদি অসত্য হয়, তাহলেও নথিপত্র প্রকাশ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রধান প্রকৌশলী মোঃ বেলাল হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা প্রশ্নগুলোর নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।
এখন দেখার বিষয়—সরকার ও সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থাগুলো কি এই অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করবে, নাকি এলজিইডির ক্ষমতাধর মহলের প্রভাবেই বিষয়টি চাপা পড়ে যাবে?

পরবর্তী পর্বে: এলকেএসএসের মাধ্যমে জনবল সরবরাহের চুক্তি, প্রকল্পভিত্তিক অর্থের হিসাব এবং ৬৫০০ কর্মীর বেতন থেকে কর্তন করা অর্থের গন্তব্য—নথি বিশ্লেষণে উঠে আসছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য।