গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন দপ্তরে প্রশাসনিক পরিবর্তন এলেও সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) ঘিরে এখনো বহাল রয়েছে আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট—এমন অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদারদের একটি অংশের কাছ থেকে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সওজের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হোসেন।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থেকে আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পুনর্বাসন, পদায়ন ও বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক সক্রিয় রেখেছেন। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ, অনিয়ম, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থপাচারের অভিযোগও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
দুদকের সুপারিশ, কিন্তু ব্যবস্থা নেই
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, মঈনুল হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অতীতে আইনগত ব্যবস্থার সুপারিশ করেছিল। তবে সেই অভিযোগের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। বরং অন্তর্বর্তী সরকার ও পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেও তিনি বহাল রয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ এই পদে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, শেখ হাসিনা সরকারের ঘনিষ্ঠ বিভিন্ন কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক তাকে এখনো প্রভাবশালী অবস্থানে রেখেছে।
আওয়ামী ঘনিষ্ঠতার নানা অভিযোগ
সৈয়দ মঈনুল হোসেনকে কেন্দ্রীয় বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সক্রিয় সদস্য হিসেবে পরিচিত বলে দাবি করা হচ্ছে। তিনি আইইবি নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ সমর্থিত প্যানেল থেকে কাউন্সিল মেম্বার নির্বাচিত হন। এছাড়া শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন কমিটির সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ নিয়েও সমালোচনা রয়েছে।
তার পারিবারিক সদস্যদের বিরুদ্ধেও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে তার আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সওজে একটি প্রভাববলয় গড়ে তোলার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টদের অনেকে।
‘মামা-ভাগ্নে সিন্ডিকেট’ অভিযোগ
সওজের একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেন, মঈনুল হোসেনের ভাগ্নে সহকারী প্রকৌশলী সৈয়দ মুনতাসির হাফিজ দীর্ঘদিন ধরে বদলি ও পদায়নে প্রভাব বিস্তার করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, মধ্যম সারির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদায়ন বা বদলির ক্ষেত্রে এই সিন্ডিকেটের অনুমোদন ছাড়া কিছুই হতো না।
বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। বিরোধী মতাদর্শের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওএসডি বা শাস্তিমূলক বদলি করার অভিযোগও রয়েছে এই চক্রের বিরুদ্ধে।
সরকারি বাসভবনে ‘টেন্ডার ছাড়াই’ কাজের অভিযোগ
প্রধান প্রকৌশলীর সরকারি বাসভবনে টেন্ডার ছাড়াই প্রায় আড়াই কোটি টাকার আসবাবপত্র ও ইন্টেরিয়র কাজ করানোর অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সেই কাজ বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তাকে পরে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হয়।
এছাড়া কিশোরগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে সেতু নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগে আলোচিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে মঈনুল হোসেনের বিরুদ্ধে।
আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তাদের পুনর্বাসনের অভিযোগ
৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক সংস্কারের সুযোগে আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তা ও সাবেক ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পুনর্বাসনের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদার ও সাধারণ কর্মকর্তাদের একাংশ এতে ক্ষুব্ধ হলেও কার্যকর কোনো পরিবর্তন আসেনি।
বিশেষ করে সাবেক বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ নেতাদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে পুনঃপদায়ন নিয়ে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ রয়েছে বলে জানা গেছে।
বিদেশ সফরের আড়ালে অর্থপাচার?
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ এসেছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ৩০ কর্মকর্তার বিদেশ সফরকে ঘিরে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রশিক্ষণ ও উচ্চশিক্ষার নামে বিদেশে পাঠানো এসব কর্মকর্তার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের অবৈধ অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
এ অভিযোগে সরাসরি মঈনুল হোসেন এবং তার স্ত্রী ফেরদৌসী শাহরিয়ারের নাম এসেছে। ফেরদৌসী শাহরিয়ার পররাষ্ট্র ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে বিদেশে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই তারা দীর্ঘদিন বিদেশে সংবেদনশীল দায়িত্বে ছিলেন।
প্রশ্নের মুখে সওজ প্রশাসন
সংশ্লিষ্ট মহলের প্রশ্ন—অভ্যুত্থানের পর যখন বিভিন্ন দপ্তরে প্রশাসনিক পরিবর্তন এসেছে, তখন সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরে কেন একই অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা বহাল রয়েছেন? কেন এখনো কার্যকর তদন্ত বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা দৃশ্যমান নয়?
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সৈয়দ মঈনুল হোসেন বা সংশ্লিষ্টদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।
প্রতিনিধির নাম 






