১০:০৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
chief engineer belal hossain of LGED GOING TO BE RETIRED

অবসরের প্রাক্কালে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন

  • প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০১:১৩:৪৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬
  • ৪৭৬ বার পড়া হয়েছে
৫৪৯

অবসরের প্রাক্কালে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসে

প্রকৌশলী হিসেবে দীর্ঘ পথচলা, উল্লেখযোগ্য অবদান, ভালো দিক ও বিতর্ক—একজন সম্পাদকের মূল্যায়ন

নিজস্ব প্রতিবেদক

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর—এলজিইডি বাংলাদেশের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সড়ক, সেতু, বাজার, পানি ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়নে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা দীর্ঘদিনের। সেই প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করা কোনো প্রকৌশলীর কর্মজীবন তাই নিছক ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দেশের হাজার হাজার কিলোমিটার স্থানীয় অবকাঠামো এবং কোটি মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তবতা।

এই প্রেক্ষাপটে প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেনের দীর্ঘ কর্মজীবনের দিকে ফিরে তাকানো প্রয়োজন। তাঁর কর্মজীবনে যেমন রয়েছে মেধা, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, প্রকল্প বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক দায়িত্ব ও অবকাঠামো উন্নয়নে ভূমিকা, তেমনি শেষ পর্যায়ের দায়িত্ব পালনকে ঘিরে কিছু অভিযোগ ও বিতর্কও প্রকাশ্যে এসেছে। একজন সরকারি কর্মকর্তার সামগ্রিক মূল্যায়নে দুই দিকই বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

মেধাবী প্রকৌশলী হিসেবে যাত্রা

এলজিইডির নিজস্ব জীবনীতে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মো. বেলাল হোসেন ১৯৬৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার নগরাজপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, রাজশাহী—বর্তমান রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (RUET)—থেকে ১৯৮৯ সালে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন এবং প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান লাভ করেন।

১৯৯২ সালের ২৮ নভেম্বর বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের মাধ্যমে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে এলজিইডিতে যোগ দেন তিনি। চাকরির শুরুতে কুমিল্লার বার্ডে মৌলিক প্রশিক্ষণেও প্রথম স্থান অর্জনের তথ্য দিয়েছে এলজিইডি। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি শ্রেষ্ঠ উপজেলা প্রকৌশলীর পুরস্কার পান।

একজন প্রকৌশলীর দীর্ঘ কর্মজীবনের শুরুতেই মাঠপর্যায়ে এমন স্বীকৃতি পাওয়া নিঃসন্দেহে তাঁর পেশাগত সক্ষমতার ইতিবাচক দিক।

মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা—কর্মজীবনের অন্যতম শক্তি

বেলাল হোসেনের ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো মাঠ প্রশাসন ও প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা। এলজিইডির জীবনীতে বলা হয়েছে, ২০১২ সালে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে গাইবান্ধায় দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিভিন্ন ধরনের চাপের মধ্যে কাজ করেন। পরে নীলফামারীতে দায়িত্ব পালন করেও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করেন।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—এলজিইডির মতো প্রতিষ্ঠানে সদর দপ্তরের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি সড়ক, কালভার্ট বা সেতুর প্রকৃত সমস্যা ফাইলের নথিতে যতটা বোঝা যায়, মাঠে গিয়ে তার বাস্তবতা অনেক সময় তার চেয়ে ভিন্ন।

বেলাল হোসেনের দীর্ঘ মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে সদর দপ্তরের বিভিন্ন দায়িত্ব পালনে তাঁকে বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে—এমন মূল্যায়নের যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে।

প্রকল্প বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য কাজ

২০২০ সালের মার্চে এলজিইডি সদর দপ্তরে কাজ শুরু করার পর তিনি পর্যায়ক্রমে উপ-প্রকল্প পরিচালক ও প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন।

এলজিইডির সরকারি জীবনী অনুযায়ী, গাইবান্ধা পৌরসভার ঘাঘট লেকের উন্নয়ন এবং বৃহৎ ব্রিজ নির্মাণ প্রকল্পের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করার সঙ্গে তাঁর দায়িত্ব পালনের সম্পর্ক রয়েছে। একই সময়ে নারায়ণগঞ্জে নির্মাণাধীন দেশের প্রথম ক্যাবল-স্টেইড ব্রিজের পরিকল্পনা, নকশা ও দরপত্র আহ্বানের কাজেও দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীদের সহযোগিতায় তিনি ভূমিকা রাখেন।

এ ধরনের প্রকল্পের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা একজন প্রকৌশলীর পেশাগত ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। বিশেষ করে বড় অবকাঠামো প্রকল্পে পরিকল্পনা, নকশা, দরপত্র ও বাস্তবায়নের বিভিন্ন স্তর সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রশাসনিক নেতৃত্বে কাজে লাগার কথা।

প্রশাসন থেকে মানবসম্পদ—বড় দায়িত্বে অভিজ্ঞতা

২০২৩ সালের ৩১ অক্টোবর তিনি এলজিইডির প্রশাসন শাখায় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব নেন। পরে ২০২৫ সালের অক্টোবরে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে মানবসম্পদ উন্নয়ন, মান নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশ-সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব পালন করেন।

এখানে তাঁর কর্মজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়। তিনি শুধু প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রকৌশলী ছিলেন না; বরং প্রশাসন, মানবসম্পদ, মান নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশের মতো নীতিনির্ধারণী বিষয়েও কাজ করেছেন।

বর্তমান সময়ে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি পরিবেশগত স্থায়িত্ব, জলবায়ু সহনশীলতা এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়গুলো ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এসব ক্ষেত্রেও তাঁর দায়িত্ব পালনের রেকর্ড রয়েছে।

গ্রামীণ সেতু ও নিরাপদ অবকাঠামো

বেলাল হোসেনের প্রকল্প পরিচালনার সময় Occupational Health and Safety বা কর্মক্ষেত্রের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নির্দেশিকা প্রণয়নের সঙ্গেও তাঁর নাম যুক্ত রয়েছে। এলজিইডির প্রকাশিত নথিতে তাঁকে Program for Supporting Rural Bridges (SupRB)-এর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক হিসেবে উল্লেখ করে নিরাপদ ও টেকসই অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এই দিকটি তাঁর কর্মজীবনের ইতিবাচক উত্তরাধিকারের একটি অংশ হতে পারে। কারণ উন্নয়ন প্রকল্পের মূল্যায়ন শুধু কত কিলোমিটার রাস্তা বা কতটি সেতু হয়েছে তা দিয়ে হওয়া উচিত নয়; নির্মাণকাজ কতটা নিরাপদ, টেকসই ও পরিবেশসম্মত হয়েছে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

জ্ঞানভিত্তিক এলজিইডির ধারণা

২০২৬ সালে প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বে থাকার সময়ে জ্ঞান ব্যবস্থাপনা, অভিজ্ঞতা সংরক্ষণ ও ডিজিটাল প্রশিক্ষণের ওপর তাঁর বক্তব্যও প্রকাশ্যে এসেছে।

এপ্রিল ২০২৬-এ LGED-CReLIC-এর একটি কর্মশালায় তিনি ভবিষ্যৎ প্রকল্পের জন্য একটি জ্ঞানভিত্তিক রিপোজিটরি তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রকল্পের অভিজ্ঞতা, ভালো চর্চা ও শিক্ষা ভবিষ্যৎ প্রকল্পে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করা প্রয়োজন।

মে মাসে আরেকটি কর্মশালায় তিনি মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলীদের দক্ষতা বাড়াতে ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন।

আর জুন ২০২৬-এ তিনি বলেন, আধুনিক বাংলাদেশ নির্মাণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সঠিক তথ্য ও জ্ঞানের সুপরিকল্পিত ব্যবহার অপরিহার্য।

একজন দীর্ঘদিনের সরকারি প্রকৌশলী যখন নিজের প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎকে তথ্য, জ্ঞান, প্রশিক্ষণ ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করেন, সেটি তাঁর প্রশাসনিক চিন্তার একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বে উত্থান

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বেলাল হোসেন প্রথমে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব পান। ফেব্রুয়ারিতে তাঁকে প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তীতে জুলাই ২০২৬-এ স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁকে প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়।

এলজিইডির সরকারি কর্মকর্তা তালিকাতেও তাঁকে প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দেখানো হয়েছে।

অর্থাৎ অবসরের প্রাক্কালে এসে তাঁর কর্মজীবনের শেষ অধ্যায়টি দেশের অন্যতম বৃহৎ স্থানীয় অবকাঠামো সংস্থার সর্বোচ্চ কারিগরি নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়েছে।

তবে সবকিছুই কি প্রশংসার?

একজন সম্পাদক হিসেবে এখানে থেমে গেলে প্রতিবেদনটি পূর্ণাঙ্গ হবে না।

বেলাল হোসেনকে নিয়ে প্রকাশিত সংবাদে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগও এসেছে। এর মধ্যে বদলি ও পদায়ন, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ এবং সম্পদসংক্রান্ত অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে জুলাই ২০২৬-এ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম তাঁর বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, সিন্ডিকেট ও বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ প্রকাশ করেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে—এমন নির্ভরযোগ্য সরকারি বা আদালতভিত্তিক সিদ্ধান্ত এই প্রতিবেদনের পর্যালোচনায় পাওয়া যায়নি। তাই এগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা উচিত, প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে নয়।

আরেকটি প্রতিবেদনে তাঁর স্বাক্ষরিত আদেশের মাধ্যমে একজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে সদর দপ্তরে সংযুক্ত করার ঘটনা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশ্ন ওঠার কথা প্রকাশিত হয়েছে।

এ ছাড়া একটি সংবাদে অভিযোগ করা হয়েছে, মন্ত্রণালয়ের আপত্তির পরও একটি উন্নয়ন প্রকল্পে বিতর্কিত একজন কর্মকর্তাকে প্রকল্প পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এটিও সংবাদমাধ্যমে উত্থাপিত অভিযোগ; এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য ও সরকারি নথি দিয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই প্রয়োজন।

অন্যদিকে, এলজিইডি কর্তৃপক্ষ সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছে যে তাদের বিরুদ্ধে ছড়ানো কিছু তথ্য ভিত্তিহীন এবং প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়মিত তদারক করা হচ্ছে।

সাংবাদিকতার নীতিতে এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো—অভিযোগ থাকলেই কেউ অপরাধী হন না, আবার অভিযোগ উঠেছে বলে সেটি অনুসন্ধান না করাও সাংবাদিকতার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। প্রমাণ, নথি, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য এবং তদন্তের ফলাফল—সবকিছুর ভিত্তিতে চূড়ান্ত মূল্যায়ন হওয়া উচিত।

তাঁর সবচেয়ে বড় ইতিবাচক পরিচয় কোথায়?

বেলাল হোসেনের দীর্ঘ কর্মজীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী দিকগুলোর একটি হলো মাঠপর্যায়ের প্রকৌশল অভিজ্ঞতা থেকে সদর দপ্তরের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে উঠে আসা।

১৯৯২ সালে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে শুরু করে উপজেলা প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী, প্রকল্প পরিচালক, প্রশাসন শাখার দায়িত্ব, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এবং শেষ পর্যন্ত প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব—এই দীর্ঘ পথচলা একজন সরকারি প্রকৌশলীর বিস্তৃত পেশাগত অভিজ্ঞতার পরিচয় বহন করে।

মেধাবী ছাত্র হিসেবে শুরু, মাঠপর্যায়ে পুরস্কার, বড় প্রকল্পে দায়িত্ব, মানবসম্পদ ও মান নিয়ন্ত্রণে কাজ, পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্যোগ, জ্ঞান ব্যবস্থাপনা ও ই-লার্নিংয়ের ওপর গুরুত্ব—সব মিলিয়ে তাঁর কর্মজীবনের একটি সুস্পষ্ট ইতিবাচক দিক রয়েছে।

অবসরের মুহূর্তে মূল্যায়ন

কোনো সরকারি কর্মকর্তার কর্মজীবনের শেষ মূল্যায়ন শুধু তাঁর পদবী দিয়ে হওয়া উচিত নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত—তিনি প্রতিষ্ঠানকে কী দিয়েছেন? তাঁর সময়ে কী পরিবর্তন হয়েছে? তাঁর সিদ্ধান্ত কতটা প্রাতিষ্ঠানিক হয়েছে? তাঁর রেখে যাওয়া ব্যবস্থা তাঁর অনুপস্থিতিতেও চলবে কি না?

বেলাল হোসেনের ক্ষেত্রে ইতিবাচক উত্তরগুলোর মধ্যে রয়েছে মাঠপর্যায়ের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রশাসনিক দায়িত্ব, মানবসম্পদ উন্নয়ন, মান নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ, পেশাগত প্রশিক্ষণ এবং জ্ঞান ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব।

তবে তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনা করতে গেলে সাম্প্রতিক সময়ে ওঠা অভিযোগগুলোকেও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে পদায়ন, প্রকল্প পরিচালক নির্বাচন এবং আর্থিক সম্পদসংক্রান্ত অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ যাচাই দাবি করে। কারণ একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধানের ক্ষেত্রে শুধু ব্যক্তিগত সততার প্রশ্ন নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক আস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

শেষ কথা

প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেনের কর্মজীবন তাই একরৈখিক কোনো গল্প নয়। এটি মেধা, মাঠের অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক দায়িত্ব, উন্নয়ন প্রকল্প, নেতৃত্ব, প্রযুক্তি ও জ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি প্রশ্ন ও বিতর্কেরও একটি অধ্যায়।

তবে ইতিহাস শেষ কথা বলে তখনই, যখন সময়ের পরীক্ষায় নথি, কাজের ফলাফল ও তদন্তের সত্য এক জায়গায় এসে দাঁড়ায়।

একজন সম্পাদক হিসেবে তাই বিদায়ের মুহূর্তে তাঁর ভালো কাজের স্বীকৃতি যেমন প্রাপ্য, তেমনি যেসব অভিযোগ জনপরিসরে উঠেছে সেগুলোর স্বচ্ছ তদন্তও প্রাপ্য। কারণ একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সম্মানের চেয়েও বড় হলো একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা।

বেলাল হোসেনের কর্মজীবনের প্রকৃত উত্তরাধিকার নির্ধারণ করবে—তিনি এলজিইডিতে কতটি ফাইল স্বাক্ষর করেছেন তা নয়; বরং তাঁর রেখে যাওয়া প্রতিষ্ঠানটি কতটা দক্ষ, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব হয়ে উঠেছে।

 

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ওয়েবসাইট

আপলোডকারীর তথ্য

MAHMUDUR RASHID

Mahmudur Radlshid serves as the Executive Editor of newsbanglabd24.com, steering the organization’s editorial vision with a sharp focus on political accountability, governance, and public-interest journalism. A seasoned newsroom strategist and political journalist, he is known for his uncompromising editorial judgment and commitment to exposing facts that shape national discourse. Under his leadership, the newsroom prioritizes investigative reporting, data-driven analysis, and ground-level political coverage that challenges power structures and amplifies public voice. He has built a reputation for maintaining editorial independence in high-pressure environments, ensuring that reporting remains factual, balanced, and resistant to external influence. His editorial direction emphasizes courage in reporting, accuracy in verification, and clarity in public communication. As Executive Editor, he oversees all editorial operations, including political desk strategy, investigative assignments, and content integrity. He actively mentors journalists within the organization, fostering a newsroom culture rooted in professional rigor, ethical responsibility, and investigative depth. Through newsbanglabd24.com, he continues to advance a journalism model centered on transparency, accountability, and fearless reporting in the public interest.
জনপ্রিয় সংবাদ

প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেনকে ঘিরে প্রশ্নের পর প্রশ্ন, অনুসন্ধানে মিলেছে সরকারি বিধি ও ব্যবসায়িক স্বার্থের সংঘাতের তথ্য৷

Verified by MonsterInsights

chief engineer belal hossain of LGED GOING TO BE RETIRED

অবসরের প্রাক্কালে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন

আপডেট সময় : ০১:১৩:৪৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬
৫৪৯

অবসরের প্রাক্কালে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসে

প্রকৌশলী হিসেবে দীর্ঘ পথচলা, উল্লেখযোগ্য অবদান, ভালো দিক ও বিতর্ক—একজন সম্পাদকের মূল্যায়ন

নিজস্ব প্রতিবেদক

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর—এলজিইডি বাংলাদেশের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সড়ক, সেতু, বাজার, পানি ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়নে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা দীর্ঘদিনের। সেই প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করা কোনো প্রকৌশলীর কর্মজীবন তাই নিছক ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দেশের হাজার হাজার কিলোমিটার স্থানীয় অবকাঠামো এবং কোটি মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তবতা।

এই প্রেক্ষাপটে প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেনের দীর্ঘ কর্মজীবনের দিকে ফিরে তাকানো প্রয়োজন। তাঁর কর্মজীবনে যেমন রয়েছে মেধা, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, প্রকল্প বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক দায়িত্ব ও অবকাঠামো উন্নয়নে ভূমিকা, তেমনি শেষ পর্যায়ের দায়িত্ব পালনকে ঘিরে কিছু অভিযোগ ও বিতর্কও প্রকাশ্যে এসেছে। একজন সরকারি কর্মকর্তার সামগ্রিক মূল্যায়নে দুই দিকই বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

মেধাবী প্রকৌশলী হিসেবে যাত্রা

এলজিইডির নিজস্ব জীবনীতে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মো. বেলাল হোসেন ১৯৬৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার নগরাজপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, রাজশাহী—বর্তমান রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (RUET)—থেকে ১৯৮৯ সালে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন এবং প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান লাভ করেন।

১৯৯২ সালের ২৮ নভেম্বর বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের মাধ্যমে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে এলজিইডিতে যোগ দেন তিনি। চাকরির শুরুতে কুমিল্লার বার্ডে মৌলিক প্রশিক্ষণেও প্রথম স্থান অর্জনের তথ্য দিয়েছে এলজিইডি। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি শ্রেষ্ঠ উপজেলা প্রকৌশলীর পুরস্কার পান।

একজন প্রকৌশলীর দীর্ঘ কর্মজীবনের শুরুতেই মাঠপর্যায়ে এমন স্বীকৃতি পাওয়া নিঃসন্দেহে তাঁর পেশাগত সক্ষমতার ইতিবাচক দিক।

মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা—কর্মজীবনের অন্যতম শক্তি

বেলাল হোসেনের ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো মাঠ প্রশাসন ও প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা। এলজিইডির জীবনীতে বলা হয়েছে, ২০১২ সালে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে গাইবান্ধায় দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিভিন্ন ধরনের চাপের মধ্যে কাজ করেন। পরে নীলফামারীতে দায়িত্ব পালন করেও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করেন।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—এলজিইডির মতো প্রতিষ্ঠানে সদর দপ্তরের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি সড়ক, কালভার্ট বা সেতুর প্রকৃত সমস্যা ফাইলের নথিতে যতটা বোঝা যায়, মাঠে গিয়ে তার বাস্তবতা অনেক সময় তার চেয়ে ভিন্ন।

বেলাল হোসেনের দীর্ঘ মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে সদর দপ্তরের বিভিন্ন দায়িত্ব পালনে তাঁকে বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে—এমন মূল্যায়নের যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে।

প্রকল্প বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য কাজ

২০২০ সালের মার্চে এলজিইডি সদর দপ্তরে কাজ শুরু করার পর তিনি পর্যায়ক্রমে উপ-প্রকল্প পরিচালক ও প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন।

এলজিইডির সরকারি জীবনী অনুযায়ী, গাইবান্ধা পৌরসভার ঘাঘট লেকের উন্নয়ন এবং বৃহৎ ব্রিজ নির্মাণ প্রকল্পের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করার সঙ্গে তাঁর দায়িত্ব পালনের সম্পর্ক রয়েছে। একই সময়ে নারায়ণগঞ্জে নির্মাণাধীন দেশের প্রথম ক্যাবল-স্টেইড ব্রিজের পরিকল্পনা, নকশা ও দরপত্র আহ্বানের কাজেও দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীদের সহযোগিতায় তিনি ভূমিকা রাখেন।

এ ধরনের প্রকল্পের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা একজন প্রকৌশলীর পেশাগত ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। বিশেষ করে বড় অবকাঠামো প্রকল্পে পরিকল্পনা, নকশা, দরপত্র ও বাস্তবায়নের বিভিন্ন স্তর সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রশাসনিক নেতৃত্বে কাজে লাগার কথা।

প্রশাসন থেকে মানবসম্পদ—বড় দায়িত্বে অভিজ্ঞতা

২০২৩ সালের ৩১ অক্টোবর তিনি এলজিইডির প্রশাসন শাখায় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব নেন। পরে ২০২৫ সালের অক্টোবরে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে মানবসম্পদ উন্নয়ন, মান নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশ-সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব পালন করেন।

এখানে তাঁর কর্মজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়। তিনি শুধু প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রকৌশলী ছিলেন না; বরং প্রশাসন, মানবসম্পদ, মান নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশের মতো নীতিনির্ধারণী বিষয়েও কাজ করেছেন।

বর্তমান সময়ে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি পরিবেশগত স্থায়িত্ব, জলবায়ু সহনশীলতা এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়গুলো ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এসব ক্ষেত্রেও তাঁর দায়িত্ব পালনের রেকর্ড রয়েছে।

গ্রামীণ সেতু ও নিরাপদ অবকাঠামো

বেলাল হোসেনের প্রকল্প পরিচালনার সময় Occupational Health and Safety বা কর্মক্ষেত্রের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নির্দেশিকা প্রণয়নের সঙ্গেও তাঁর নাম যুক্ত রয়েছে। এলজিইডির প্রকাশিত নথিতে তাঁকে Program for Supporting Rural Bridges (SupRB)-এর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক হিসেবে উল্লেখ করে নিরাপদ ও টেকসই অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এই দিকটি তাঁর কর্মজীবনের ইতিবাচক উত্তরাধিকারের একটি অংশ হতে পারে। কারণ উন্নয়ন প্রকল্পের মূল্যায়ন শুধু কত কিলোমিটার রাস্তা বা কতটি সেতু হয়েছে তা দিয়ে হওয়া উচিত নয়; নির্মাণকাজ কতটা নিরাপদ, টেকসই ও পরিবেশসম্মত হয়েছে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

জ্ঞানভিত্তিক এলজিইডির ধারণা

২০২৬ সালে প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বে থাকার সময়ে জ্ঞান ব্যবস্থাপনা, অভিজ্ঞতা সংরক্ষণ ও ডিজিটাল প্রশিক্ষণের ওপর তাঁর বক্তব্যও প্রকাশ্যে এসেছে।

এপ্রিল ২০২৬-এ LGED-CReLIC-এর একটি কর্মশালায় তিনি ভবিষ্যৎ প্রকল্পের জন্য একটি জ্ঞানভিত্তিক রিপোজিটরি তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রকল্পের অভিজ্ঞতা, ভালো চর্চা ও শিক্ষা ভবিষ্যৎ প্রকল্পে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করা প্রয়োজন।

মে মাসে আরেকটি কর্মশালায় তিনি মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলীদের দক্ষতা বাড়াতে ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন।

আর জুন ২০২৬-এ তিনি বলেন, আধুনিক বাংলাদেশ নির্মাণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সঠিক তথ্য ও জ্ঞানের সুপরিকল্পিত ব্যবহার অপরিহার্য।

একজন দীর্ঘদিনের সরকারি প্রকৌশলী যখন নিজের প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎকে তথ্য, জ্ঞান, প্রশিক্ষণ ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করেন, সেটি তাঁর প্রশাসনিক চিন্তার একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বে উত্থান

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বেলাল হোসেন প্রথমে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব পান। ফেব্রুয়ারিতে তাঁকে প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তীতে জুলাই ২০২৬-এ স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁকে প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়।

এলজিইডির সরকারি কর্মকর্তা তালিকাতেও তাঁকে প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দেখানো হয়েছে।

অর্থাৎ অবসরের প্রাক্কালে এসে তাঁর কর্মজীবনের শেষ অধ্যায়টি দেশের অন্যতম বৃহৎ স্থানীয় অবকাঠামো সংস্থার সর্বোচ্চ কারিগরি নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়েছে।

তবে সবকিছুই কি প্রশংসার?

একজন সম্পাদক হিসেবে এখানে থেমে গেলে প্রতিবেদনটি পূর্ণাঙ্গ হবে না।

বেলাল হোসেনকে নিয়ে প্রকাশিত সংবাদে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগও এসেছে। এর মধ্যে বদলি ও পদায়ন, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ এবং সম্পদসংক্রান্ত অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে জুলাই ২০২৬-এ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম তাঁর বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, সিন্ডিকেট ও বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ প্রকাশ করেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে—এমন নির্ভরযোগ্য সরকারি বা আদালতভিত্তিক সিদ্ধান্ত এই প্রতিবেদনের পর্যালোচনায় পাওয়া যায়নি। তাই এগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা উচিত, প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে নয়।

আরেকটি প্রতিবেদনে তাঁর স্বাক্ষরিত আদেশের মাধ্যমে একজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে সদর দপ্তরে সংযুক্ত করার ঘটনা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশ্ন ওঠার কথা প্রকাশিত হয়েছে।

এ ছাড়া একটি সংবাদে অভিযোগ করা হয়েছে, মন্ত্রণালয়ের আপত্তির পরও একটি উন্নয়ন প্রকল্পে বিতর্কিত একজন কর্মকর্তাকে প্রকল্প পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এটিও সংবাদমাধ্যমে উত্থাপিত অভিযোগ; এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য ও সরকারি নথি দিয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই প্রয়োজন।

অন্যদিকে, এলজিইডি কর্তৃপক্ষ সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছে যে তাদের বিরুদ্ধে ছড়ানো কিছু তথ্য ভিত্তিহীন এবং প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়মিত তদারক করা হচ্ছে।

সাংবাদিকতার নীতিতে এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো—অভিযোগ থাকলেই কেউ অপরাধী হন না, আবার অভিযোগ উঠেছে বলে সেটি অনুসন্ধান না করাও সাংবাদিকতার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। প্রমাণ, নথি, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য এবং তদন্তের ফলাফল—সবকিছুর ভিত্তিতে চূড়ান্ত মূল্যায়ন হওয়া উচিত।

তাঁর সবচেয়ে বড় ইতিবাচক পরিচয় কোথায়?

বেলাল হোসেনের দীর্ঘ কর্মজীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী দিকগুলোর একটি হলো মাঠপর্যায়ের প্রকৌশল অভিজ্ঞতা থেকে সদর দপ্তরের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে উঠে আসা।

১৯৯২ সালে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে শুরু করে উপজেলা প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী, প্রকল্প পরিচালক, প্রশাসন শাখার দায়িত্ব, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এবং শেষ পর্যন্ত প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব—এই দীর্ঘ পথচলা একজন সরকারি প্রকৌশলীর বিস্তৃত পেশাগত অভিজ্ঞতার পরিচয় বহন করে।

মেধাবী ছাত্র হিসেবে শুরু, মাঠপর্যায়ে পুরস্কার, বড় প্রকল্পে দায়িত্ব, মানবসম্পদ ও মান নিয়ন্ত্রণে কাজ, পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্যোগ, জ্ঞান ব্যবস্থাপনা ও ই-লার্নিংয়ের ওপর গুরুত্ব—সব মিলিয়ে তাঁর কর্মজীবনের একটি সুস্পষ্ট ইতিবাচক দিক রয়েছে।

অবসরের মুহূর্তে মূল্যায়ন

কোনো সরকারি কর্মকর্তার কর্মজীবনের শেষ মূল্যায়ন শুধু তাঁর পদবী দিয়ে হওয়া উচিত নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত—তিনি প্রতিষ্ঠানকে কী দিয়েছেন? তাঁর সময়ে কী পরিবর্তন হয়েছে? তাঁর সিদ্ধান্ত কতটা প্রাতিষ্ঠানিক হয়েছে? তাঁর রেখে যাওয়া ব্যবস্থা তাঁর অনুপস্থিতিতেও চলবে কি না?

বেলাল হোসেনের ক্ষেত্রে ইতিবাচক উত্তরগুলোর মধ্যে রয়েছে মাঠপর্যায়ের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রশাসনিক দায়িত্ব, মানবসম্পদ উন্নয়ন, মান নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ, পেশাগত প্রশিক্ষণ এবং জ্ঞান ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব।

তবে তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনা করতে গেলে সাম্প্রতিক সময়ে ওঠা অভিযোগগুলোকেও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে পদায়ন, প্রকল্প পরিচালক নির্বাচন এবং আর্থিক সম্পদসংক্রান্ত অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ যাচাই দাবি করে। কারণ একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধানের ক্ষেত্রে শুধু ব্যক্তিগত সততার প্রশ্ন নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক আস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

শেষ কথা

প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেনের কর্মজীবন তাই একরৈখিক কোনো গল্প নয়। এটি মেধা, মাঠের অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক দায়িত্ব, উন্নয়ন প্রকল্প, নেতৃত্ব, প্রযুক্তি ও জ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি প্রশ্ন ও বিতর্কেরও একটি অধ্যায়।

তবে ইতিহাস শেষ কথা বলে তখনই, যখন সময়ের পরীক্ষায় নথি, কাজের ফলাফল ও তদন্তের সত্য এক জায়গায় এসে দাঁড়ায়।

একজন সম্পাদক হিসেবে তাই বিদায়ের মুহূর্তে তাঁর ভালো কাজের স্বীকৃতি যেমন প্রাপ্য, তেমনি যেসব অভিযোগ জনপরিসরে উঠেছে সেগুলোর স্বচ্ছ তদন্তও প্রাপ্য। কারণ একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সম্মানের চেয়েও বড় হলো একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা।

বেলাল হোসেনের কর্মজীবনের প্রকৃত উত্তরাধিকার নির্ধারণ করবে—তিনি এলজিইডিতে কতটি ফাইল স্বাক্ষর করেছেন তা নয়; বরং তাঁর রেখে যাওয়া প্রতিষ্ঠানটি কতটা দক্ষ, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব হয়ে উঠেছে।