
নেতৃত্বের পরিবর্তনের আলোচনা ঘিরে বড় প্রশ্ন—এলজিইডিতে কি বদলাবে প্রশাসনিক সংস্কৃতি, নাকি শুধু বদলাবে মুখ?
বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর—এলজিইডি—বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। দেশের গ্রামীণ সড়ক, সেতু, কালভার্ট, বাজার, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের অবকাঠামোসহ অসংখ্য উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। ফলে এলজিইডির প্রশাসনিক সংস্কৃতি, প্রকৌশলীদের কর্মপরিবেশ, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন শুধু একটি সরকারি দপ্তরের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিপুল সরকারি অর্থ এবং কোটি মানুষের উন্নয়ন-সুবিধা।
এই বাস্তবতায় মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে পরিবর্তন নিয়ে যেকোনো আলোচনা স্বাভাবিকভাবেই এলজিইডির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। বিশেষ করে প্রকৌশলী মহলে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত বিভিন্ন বিষয়—পদায়ন, পদোন্নতি, জ্যেষ্ঠতা, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, প্রকল্পের মান, ঠিকাদারি ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ—এসব ক্ষেত্রে নতুন নেতৃত্ব কী ধরনের অবস্থান নেবে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
তবে শুরুতেই তথ্যগত বিষয়টি পরিষ্কার করা জরুরি। ১৬ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত পাওয়া নির্ভরযোগ্য সূত্রে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জায়গায় “সালাউদ্দীন” স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়েছেন—এমন সরকারি প্রজ্ঞাপন বা নির্ভরযোগ্য নিশ্চিত সংবাদ পাওয়া যায়নি। বরং জুলাই ২০২৬-এর সাম্প্রতিক সংবাদেও মির্জা ফখরুলকেই স্থানীয় সরকারমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অতএব “মির্জা ফখরুলের বদলে সালাউদ্দীন” বিষয়টি বর্তমানে নিশ্চিত নিয়োগের সংবাদ হিসেবে নয়, বরং সম্ভাব্য নেতৃত্ব পরিবর্তনকে ঘিরে একটি বিশ্লেষণী প্রশ্ন হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিযুক্ত।
নেতৃত্ব বদলালেই কি সংস্কৃতি বদলায়?
এলজিইডির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্ভবত এখানেই।
একজন মন্ত্রী পরিবর্তিত হলেই একটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক সংস্কৃতি রাতারাতি বদলে যায় না। কারণ মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক নেতৃত্ব নীতিগত দিকনির্দেশনা দিতে পারে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বড় অংশ নির্ভর করে সচিবালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, এলজিইডির প্রধান কার্যালয়, অঞ্চল, জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ের প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর।
অর্থাৎ নতুন মন্ত্রী এলেই যদি পুরোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি, পদায়ন কাঠামো, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, দরপত্র প্রক্রিয়া এবং জবাবদিহিতার কাঠামো অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে নেতৃত্বের পরিবর্তনের সুফল সীমিত হয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি স্পষ্টভাবে মেধা, দক্ষতা, জ্যেষ্ঠতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতাকে প্রাতিষ্ঠানিক নীতিতে পরিণত করতে পারে, তাহলে পরিবর্তনের বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হয়।
মির্জা ফখরুলের আমলে কী বার্তা এসেছে?
মির্জা ফখরুল দায়িত্ব নেওয়ার পর স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা এবং দুর্নীতি কমানোর বিষয়ে একাধিকবার বক্তব্য দিয়েছেন। ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী ও দুর্নীতিমুক্ত করার কথা বলেন।
মে মাসে জেলা প্রশাসক সম্মেলনের পর তিনি বলেন, স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে এবং মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সেসব বিষয় তদন্ত করার কথা। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান।
জুলাইতেও তিনি স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার ওপর জোর দিয়ে বলেন, কার্যকর ও ক্ষমতাবান স্থানীয় সরকার গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে পারে।
এ বক্তব্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রকৃত মূল্যায়ন হবে বাস্তব প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে।
এলজিইডির প্রকৌশলীদের প্রত্যাশা কোথায়?
এলজিইডির সাধারণ প্রকৌশলীদের মধ্যে আলোচিত অন্যতম বিষয় হলো—যোগ্যতা, মেধা ও জ্যেষ্ঠতার যথাযথ মূল্যায়ন।
একটি বড় প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানে পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে যদি স্বচ্ছ, পূর্বনির্ধারিত এবং যাচাইযোগ্য মানদণ্ড থাকে, তাহলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আস্থা তৈরি হয়। বিপরীতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা বা ব্যক্তিগত প্রভাবের অভিযোগ তৈরি হলে প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এখানেই নতুন নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় সুযোগ।
যদি ভবিষ্যতে কোনো নেতৃত্ব পরিবর্তন হয়, তাহলে প্রথম কাজ হওয়া উচিত—পদায়ন, পদোন্নতি ও দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে লিখিত ও পরিমাপযোগ্য মানদণ্ড আরও শক্তিশালী করা।
বিশেষ করে কে কোন পদে যাবেন, কেন যাবেন এবং তার যোগ্যতা কী—এসব বিষয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের একটি নিরীক্ষাযোগ্য রেকর্ড থাকা প্রয়োজন।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ: আস্থার বড় পরীক্ষা
এলজিইডিতে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা প্রকৌশলীদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। এ ধরনের নিয়োগ কখনো কখনো অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর যুক্তিতে সমর্থন পেতে পারে। আবার অন্যদিকে কর্মরত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ক্যারিয়ার কাঠামো ও পদোন্নতির সুযোগ নিয়ে প্রশ্নও তৈরি হতে পারে।
এখানে মূল বিষয় ব্যক্তি নয়—নীতি।
যদি কোনো পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ অপরিহার্য হয়, তাহলে তার প্রয়োজনীয়তা, যোগ্যতার মানদণ্ড, মেয়াদ এবং প্রত্যাশিত ফলাফল প্রকাশ্য ও যুক্তিসংগত হওয়া উচিত।
অন্যথায় সাধারণ প্রকৌশলীদের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে দীর্ঘদিন চাকরি করা কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত ক্যারিয়ার পথের বাইরে গিয়ে বিশেষ ব্যবস্থার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
নতুন নেতৃত্বের জন্য তাই একটি স্পষ্ট নীতি হতে পারে—চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ হবে ব্যতিক্রম, নিয়ম নয়; এবং ব্যতিক্রম হলে তার কারণও নথিভুক্ত থাকবে।
দুর্নীতি প্রতিরোধে শুধু বক্তব্য যথেষ্ট নয়
এলজিইডির মতো বিশাল উন্নয়ন বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি প্রতিরোধ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ এখানে প্রকল্প পরিকল্পনা থেকে শুরু করে দরপত্র, কাজের মান যাচাই, বিল প্রদান, পরিমাপ, ঠিকাদার ব্যবস্থাপনা এবং প্রকল্প সমাপ্তি—প্রতিটি স্তরেই আর্থিক সিদ্ধান্ত জড়িত।
সাম্প্রতিক সময়ে এলজিইডির মাঠপর্যায়ের একটি ঘটনায় ঘুষ দাবির অভিযোগ এবং একজন ঠিকাদারকে অফিসকক্ষে আটকে রাখার অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে এসেছে। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা অবশ্য ঘুষের অভিযোগ অস্বীকার করে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই ঘটনাকে পুরো এলজিইডির চিত্র হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু এ ধরনের অভিযোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে—মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক আচরণ এবং সেবাদানের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নজরদারি ও অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?
নতুন নেতৃত্ব চাইলে এখানেই দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পারে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে ‘গতি’ বনাম ‘গুণগত মান’
এলজিইডির আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং একই সঙ্গে কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করা।
শুধু অর্থবছর শেষ হওয়ার আগে বরাদ্দ ব্যয় করা উন্নয়নের সাফল্য নয়। একটি রাস্তা বা সেতু সময়মতো নির্মাণের পাশাপাশি সেটি নির্ধারিত মান বজায় রেখে নির্মিত হয়েছে কি না, তার স্থায়িত্ব কতটা, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কত হবে—এসবও বিবেচনায় আসতে হবে।
তাই নতুন প্রশাসনিক সংস্কৃতির অন্যতম সূচক হওয়া উচিত ‘কত টাকা খরচ হলো’ নয়; বরং ‘কতটা মানসম্পন্ন কাজ হলো’।
জবাবদিহিতার নতুন কাঠামো প্রয়োজন
এলজিইডিতে প্রকৃত পরিবর্তন আনতে হলে শুধু কর্মকর্তাদের বদলি বা পদায়ন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি শক্তিশালী জবাবদিহিতা কাঠামো।
প্রতিটি বড় প্রকল্পে নিয়মিত তৃতীয় পক্ষের গুণগত মান যাচাই, প্রকল্পের অগ্রগতি অনলাইনে প্রকাশ, ঠিকাদারের কাজের কর্মক্ষমতা মূল্যায়ন এবং অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি ব্যবস্থা কার্যকর করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠলে প্রাথমিক যাচাই এবং প্রয়োজনীয় তদন্তের জন্য নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া থাকা দরকার।
নতুন নেতৃত্বের সামনে পাঁচটি অগ্রাধিকার
যদি ভবিষ্যতে এলজিইডির রাজনৈতিক নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে, তাহলে পাঁচটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে—
প্রথমত, পদোন্নতি ও পদায়নে মেধা, যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতার স্বচ্ছ কাঠামো।
দ্বিতীয়ত, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে স্পষ্ট ও প্রকাশ্য নীতিমালা।
তৃতীয়ত, প্রকল্পের গুণগত মান নিশ্চিত করতে স্বাধীন কারিগরি অডিট।
চতুর্থত, ঠিকাদার ও প্রকৌশলী উভয়ের জন্য সমানভাবে কার্যকর জবাবদিহিতা।
পঞ্চমত, দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিক ব্যবস্থা।
শেষ কথা: বদল চাইলে শুধু চেয়ার বদল যথেষ্ট নয়
এলজিইডিতে নেতৃত্ব পরিবর্তন হবে কি না, কে দায়িত্ব নেবেন—এটি শেষ পর্যন্ত সরকারের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত সংস্কারের প্রশ্নটি তার চেয়েও বড়।
কারণ একজন মন্ত্রী বদলাতে পারেন, একজন প্রধামির্জা ফখরুলের বদলে সালাউদ্দীন: এলজিইডিতে এবার কি বদলাবে সংস্কৃতি?
নেতৃত্বের পরিবর্তনের আলোচনা ঘিরে বড় প্রশ্ন—এলজিইডিতে কি বদলাবে প্রশাসনিক সংস্কৃতি, নাকি শুধু বদলাবে মুখ?
বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
প্রতিনিধির নাম 






