
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) শীর্ষ প্রশাসনিক নেতৃত্ব ও পরবর্তী প্রধান প্রকৌশলী পদের সম্ভাব্য দাবিদার
বিশেষ প্রতিবেদক : নানামুখী প্রতিক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক গ্রহন যোগ্যতা যোগ্যতা নির্ধারনে সর্বপ্রথম নিয়ামক।
ভূমিকা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশাসনিক প্রেক্ষাপট:
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) বাংলাদেশের গ্রামীণ ও নগর অবকাঠামো উন্নয়ন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আবহাওয়া সহনশীল ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে প্রধান রাষ্ট্রীয় সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছে। সংস্থাটির প্রশাসনিক ও কারিগরি শীর্ষে অবস্থান করেন প্রধান প্রকৌশলী (গ্রেড-১), যিনি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বিশাল বাজেট বাস্তবায়ন এবং বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) সহ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে যৌথ প্রকল্প পরিচালনায় নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করেন।
সাম্প্রতিক সময়ে সংস্থাটির শীর্ষ প্রশাসনিক নেতৃত্বে ঘনঘন পরিবর্তন, ‘রুটিন দায়িত্ব’ (Routine Charge), ‘চলতি দায়িত্ব’ (Current Charge) এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রথা লক্ষ্য করা গেছে। ফলে নিয়মিত পদোন্নতির মাধ্যমে একটি স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদী প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা স্থানীয় সরকার বিভাগ (এলজিডি) ও সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্বে পরিণত হয়েছে। বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীর মেয়াদকাল, সরকারি চাকরি বিধি, জ্যেষ্ঠতা তালিকা এবং প্রশাসনিক দক্ষতার বিচারে পরবর্তীতে কে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী পদে অধিষ্ঠিত হতে পারেন—তা নির্ধারণে সংস্থাটির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (গ্রেড-৩) স্তরের কর্মকর্তাদের কর্মজীবন, জ্যেষ্ঠতাক্রম ও অবসরগ্রহণের সময়সীমা বিশদভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
এলজিইডির প্রশাসনিক কাঠামো ও নেতৃত্ব পদায়ন প্রথা
এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী পদে নিয়োগ মূলত সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এবং নন-ক্যাডার কর্মকর্তা ও কর্মচারী (জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি) বিধিমালা, ২০১১ অনুযায়ী পরিচালিত হয়। অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (গ্রেড-৩) পদে কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে জ্যেষ্ঠতা, দক্ষতা এবং সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) সুপারিশের ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রীর সদয় অনুমোদনে স্থানীয় সরকার বিভাগ এই পদোন্নতি বা পদায়ন প্রদান করে থাকে।
সংস্থার সাম্প্রতিক প্রশাসনিক পদায়নের ধারা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেনের অবসরগ্রহণের পর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী জাভেদ করিম ২০তম প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে রুটিন দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি মোঃ বেলাল হোসেন প্রধান প্রকৌশলী (রুটিন দায়িত্ব) পদে দায়িত্ব নেন এবং একই বছরের ১৯ জুলাই তাকে জাতীয় বেতনস্কেল-২০১৫ অনুযায়ী ৭৮ হাজার টাকা নির্ধারিত বেতনক্রমে প্রধান প্রকৌশলী (গ্রেড-১) পদে পূর্ণাঙ্গ পদোন্নতি দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ মিয়াকে তাঁর অবসর-উত্তর ছুটি (পিআরএল) স্থগিতের শর্তে সরকারি চাকরি আইনের ৪৯ ধারা অনুযায়ী এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রদান করা হয়েছিল।
নেতৃত্বের ধারা সুসংহত করতে ২০২৬ সালের ৩০ জুন স্থানীয় সরকার বিভাগ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও এসএসবির অনুমোদনক্রমে একাধিক চলতি দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলীকে নিয়মিত ভিত্তিতে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (গ্রেড-৩) পদে পদোন্নতি প্রদান করে, যা এলজিইডির পরবর্তী প্রধান প্রকৌশলী নির্বাচনের জন্য নিয়মিত ফিডার পদ (Feeder Post) তৈরি করেছে।
জনাব আবুল বাছেদ মোহাম্মদ রেজাউল বারী
আবুল বাছেদ মোহাম্মদ রেজাউল বারী বর্তমানে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থানে রয়েছেন। তিনি ১৯৯২ সালের ২৬ নভেম্বর এলজিইডিতে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে রাজস্ব খাতে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। শিক্ষাগত যোগ্যতায় তিনি পুরকৌশলে স্নাতক এবং পরিবেশ বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর (MS in Environmental Science) ডিগ্রি অর্জন করেছেন। কর্মজীবনে তিনি আইসিটি ইউনিটের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, ঢাকা বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) এবং পরবর্তী সময়ে পরিকল্পনা, ডিজাইন ও গবেষণা ইউনিটের দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৬ সালের ৩০ জুন স্থানীয় সরকার বিভাগের ২০২৬/১৮১ নম্বর স্মারকে তাঁকে নিয়মিত অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (গ্রেড-৩) পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। জ্যেষ্ঠতাক্রম ২৭৬-এ থাকা এই কর্মকর্তার জন্ম তারিখ ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৮ এবং সরকারি চাকরির সংবিধি অনুযায়ী তাঁর অবসরগ্রহণের তারিখ ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৭। এলজিইডির অধিকাংশ জ্যেষ্ঠ অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ২০২৬ সালের মাঝামাঝি বা শেষের দিকে পিআরএলে চলে যাওয়ায়, ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চাকরির বিস্তৃত মেয়াদ থাকায় তিনি প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার বিচারে সবচেয়ে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।
নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি চ্যালেঞ্জ
এলজিইডির শীর্ষ পদায়নের প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল এবং বেশ কিছু প্রশাসনিক ও আইনি চ্যালেঞ্জ দ্বারা প্রভাবিত। প্রথমত, ১ম শ্রেণির প্রকৌশলীদের জ্যেষ্ঠতা তালিকা ২০০৮ বনাম ২০১৫ অনুসরণ নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ও আইনি বিবাদ বিদ্যমান। কিছু কর্মকর্তা ২০০৮ সালের তালিকা এবং কিছু কর্মকর্তা ২০১৫ সালের তালিকা ধরে পদোন্নতির দাবি জানিয়ে প্রশাসনিক আপিল ট্রাইব্যুনালে (যেমন AAT 342/2022) মামলা দায়ের করেছেন। যদিও স্থানীয় সরকার বিভাগ ২০২৬ সালে খসড়া জ্যেষ্ঠতা তালিকা প্রকাশ করেছে, তবুও আইনি জটিলতার ছায়া পদোন্নতির স্বাভাবিক গতিকে মাঝে মাঝেই শ্লথ করে দেয়।
দ্বিতীয়ত, সংস্থায় দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া ‘পদোন্নতি জট’ ও চলতি দায়িত্বের সংস্কৃতি শীর্ষ পদের পদায়নে প্রভাব ফেলে। অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর অনেকগুলো পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকায় মাঠপর্যায়ে ও সদর দপ্তরে অতিরিক্ত দায়িত্বে কাজ চালাতে হয়েছে। এর সাথে যোগ হয়েছে প্রবেশ পদে নিয়োগ সংক্রান্ত লিটিগেশন; উদাহরণস্বরূপ, ৪০তম বিসিএস নন-ক্যাডার থেকে ১৫৬ জন সহকারী প্রকৌশলী নিয়োগে সুপ্রিম কোর্টের স্থা্য়ী আদেশ এবং নতুন কোটা নীতি (৯৩% মেধার ভিত্তিতে) প্রয়োগ নিয়ে আইনি আলোচনা, যা সামগ্রিক প্রশাসনিক শৃঙ্খলাকে প্রভাবিত করে।
প্রাতিষ্ঠানিক প্রবাহ, বৈদেশিক প্রকল্প ও দ্বিতীয়-তৃতীয় মাত্রার প্রভাব
সংস্থার প্রধান প্রকৌশলী নির্বাচনের সিদ্ধান্তটি কেবল একজন ব্যক্তির পদায়ন নয়, বরং এটি সমগ্র উন্নয়ন অবকাঠামো খাতের ওপর বহুমুখী প্রভাব ফেলে। এলজিইডি বর্তমানে বিশ্বব্যাংক, এডিবি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সহযোগীদের সহায়তায় ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট লোকাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার সেন্টার (CRILIC) এবং প্রোগ্রাম ফর সাপোর্টিং রুরাল ব্রিজেস (SupRB)-এর মতো বহু শতকোটি টাকার পরিবেশ-সহনশীল প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। নিয়মিত এবং দীর্ঘমেয়াদের একজন প্রধান প্রকৌশলী বহাল থাকলে বিদেশি অর্থায়ন নিশ্চিতকরণ ও আন্তর্জাতিক ফোরামে দরকষাকষির সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
তদুপরি, শীর্ষ নেতৃত্বে স্থায়িত্ব এলে মাঠপর্যায়ের জেলা ও উপজেলা কার্যালয়সমূহে বদলি ও পদায়নে স্বচ্ছতা আসে। অতীতে ঘনঘন নেতৃত্ব পরিবর্তন বা অস্থায়ী পদের কারণে নির্বাহী প্রকৌশলী ও উপজেলা প্রকৌশলী পর্যায়ে নানাবিধ প্রশাসনিক অসন্তোষ ও বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। নিয়মিত প্রশাসনিক প্রধান দায়িত্বে এলে কাজের উত্তরদিহিতা নিশ্চিত হয় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে গতিশীলতা ফিরে আসে, যা সার্বিকভাবে গ্রামীণ অর্থনীতি ও স্থানীয় অবকাঠামো রূপান্তরে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
নীতিগত সুপারিশ ও চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ
সমস্ত প্রশাসনিক নথি, ২০২৬ সালের খসড়া জ্যেষ্ঠতা তালিকা, সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের অনুমোদন এবং কর্মকর্তাদের অবশরের সময়সীমা পর্যালোচনা করে উপসংহারে বলা যায় যে, এলজিইডির পরবর্তী নিয়মিত প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার ক্ষেত্রে জনাব আবুল বাছেদ মোহাম্মদ রেজাউল বারী সর্বাধিক উপযুক্ত ও অগ্রগণ্য প্রার্থী। ২০২৬ সালের ৩০ জুন নিয়মিত অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (গ্রেড-৩) হিসেবে তাঁর পদোন্নতি নিশ্চিত হওয়া এবং ২০২৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সরকারি চাকরির মেয়াদ থাকা তাঁকে প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার বিচারে অনন্য সুবিধা প্রদান করেছে।
তবে এলজিইডির প্রাতিষ্ঠানিক স্থায়িত্ব, মেগা প্রকল্পসমূহের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন এবং অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য অন্তর্বর্তী প্রথার পরিবর্তে জনাব আবুল বাছেদ মোহাম্মদ রেজাউল বারীর মতো যোগ্য ও দীর্ঘমেয়াদী চাকরির সুবিধাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে পূর্ণাঙ্গ প্রধান প্রকৌশলী (গ্রেড-১) পদে পদায়ন করাই স্থানীয় সরকার বিভাগের জন্য সবচেয়ে প্রশাসনিক ও কৌশলগতভাবে যুক্তিযুক্ত পদক্ষেপ হবে।
প্রতিনিধির নাম 






