
সেতু ভবনে আগুন: নাশকতা, দুর্নীতি নাকি প্রমাণ গায়েবের চেষ্টা?
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
রাজধানীর বনানীর সেতু ভবনে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডকে সরকারিভাবে “সহিংসতা” ও “ভাঙচুর” হিসেবে তুলে ধরা হলেও, ঘটনাটিকে ঘিরে এখনো রয়ে গেছে বহু অমীমাংসিত প্রশ্ন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, কোটা আন্দোলন চলাকালে সেতু ভবনে হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—
আগুন কি কেবল বিক্ষোভের বিশৃঙ্খলার অংশ ছিল, নাকি এর আড়ালে ছিল আরও গভীর কোনো উদ্দেশ্য?
কোন নথি পুড়েছে, কোনগুলো বেঁচে গেছে?
সেতু ভবন হচ্ছে দেশের বহু মেগা প্রকল্প, সেতু নির্মাণ, টেন্ডার, ঠিকাদারি বিল, প্রকৌশল অনুমোদন ও আর্থিক নথির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরেই এই খাতে অতিমূল্যায়ন, টেন্ডার সিন্ডিকেট এবং কমিশন বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা ছিল প্রশাসনিক মহলে।
অগ্নিকাণ্ডের পর এখনো প্রকাশ্যে আসেনি—
- কোন কোন বিভাগ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে,
- কী কী নথি ধ্বংস হয়েছে,
- কোনো ডিজিটাল ব্যাকআপ ছিল কি না,
- বা স্বাধীন ফরেনসিক তদন্ত হয়েছে কি না।
এমনকি ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে সরকারিভাবে “প্রায় ৩০০ কোটি টাকা” দাবি করা হলেও তার বিস্তারিত হিসাবও প্রকাশ হয়নি।
প্রধান প্রকৌশলী ও প্রভাবশালী চক্রের প্রশ্ন
বিভিন্ন অনলাইন প্রতিবেদনে অভিযোগ উঠেছে, সেতু বিভাগের কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষমতাবান অবস্থানে রয়েছেন এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তাদের অবস্থান অপরিবর্তিত। যদিও এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ প্রমাণ এখনো প্রকাশ হয়নি, তবে প্রশ্ন উঠেছে—
তদন্তের আওতায় কি সব প্রভাবশালী কর্মকর্তাকে আনা হয়েছে?
যদি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক নথি বা প্রকল্পসংক্রান্ত তথ্য আগুনে নষ্ট হয়ে থাকে, তাহলে এর সুবিধাভোগী কারা?
ফায়ার সার্ভিস কেন দ্রুত পৌঁছাতে পারেনি?
সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে যেতে বিলম্বের মুখে পড়ে। কিছু রাস্তায় বাধা থাকায় ইউনিটগুলো দ্রুত পৌঁছাতে পারেনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনায় যদি পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, স্প্রিংকলার, ডিজিটাল আর্কাইভ এবং জরুরি সুরক্ষা প্রটোকল কার্যকর থাকত, তাহলে ক্ষয়ক্ষতি অনেক কমানো যেত।
তদন্ত কতটা স্বচ্ছ?
বাংলাদেশে অতীতের বহু অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় “শর্ট সার্কিট” বা “দুর্ঘটনা” ব্যাখ্যা সামনে এসেছে।
কিন্তু বড় সরকারি স্থাপনায় আগুনের ঘটনায় সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, বিশেষত যখন দুর্নীতি বা নথি গায়েবের গুঞ্জন থাকে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন আলোচনায় অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন—
গুরুত্বপূর্ণ নথি কি নিরাপদ আছে? স্বাধীন তদন্ত কি আদৌ হয়েছে?
জনস্বার্থে যেসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন
- সেতু ভবনের কোন কোন ফ্লোর বা বিভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল?
- কোনো প্রকল্পসংক্রান্ত নথি স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়েছে কি?
- তদন্ত কমিটির পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট কি প্রকাশ করা হবে?
- ক্ষতির প্রকৃত হিসাব কী?
- যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ছিল, তাদের ভূমিকা তদন্ত হয়েছে কি?
- ডিজিটাল ডকুমেন্ট ব্যাকআপ ব্যবস্থা কেন কার্যকর ছিল না?
উপসংহার
সেতু ভবনের আগুন শুধু একটি অগ্নিকাণ্ড নয়; এটি রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা, নথি সুরক্ষা এবং অবকাঠামো খাতে স্বচ্ছতার বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও প্রকাশ্য তদন্ত ছাড়া এই ঘটনার প্রকৃত সত্য হয়তো কখনোই পুরোপুরি সামনে আসবে না।
প্রতিনিধির নাম 





