
২০২৬ সালের মার্চ মাসে স্থানীয় সরকার বিভাগের এক আদেশে সৌরভ দাসকে নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর) (চলতি দায়িত্ব) পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, পদোন্নতি প্রাপ্ত হওয়ার পর তাকে প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয়ে যোগদান করে নতুন পদায়ন গ্রহণ করার কথা। কিন্তু তিনি রহস্যজনক কারণে চকরিয়া উপজেলার দায়িত্ব ছাড়ছেন না।
চেইন অফ কমান্ডের সংকট:
সৌরভ দাসের মেয়াদে সবচেয়ে আলোচিত অনিয়মটি ঘটেছে ডুলাহাজারা থেকে বহলতলী পর্যন্ত এলজিইডি-র ১০ কোটি টাকা ব্যয়ের আরসিসি (RCC) সড়ক প্রকল্পে
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত অনিয়মসমূহ:
চকরিয়ার কোনাখালী-ঢেমুশিয়া সড়ক সংস্কার কাজেও ব্যাপক দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। ১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা বরাদ্দের এই প্রকল্পে প্রতিটি ধাপেই ছিল কমিশন বাণিজ্যের থাবা ।
কেবল এলজিইডি নয়, সৌরভ দাসের তদারকির অভাব ও উদাসীনতা লক্ষ্য করা গেছে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ২১ কোটি টাকার রিজিওনাল ট্রেনিং সেন্টার নির্মাণ প্রকল্পেও ।
সৌরভ দাসের বর্তমান কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করতে গেলে তার পেশাগত ইতিহাসের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। চকরিয়ায় আসার আগে তিনি ফেনী জেলায় সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন । ফেনীতে থাকাকালীন তিনি বিভিন্ন ল্যাবরেটরি টেস্ট রিপোর্ট এবং কনস্ট্রাকশন মেটেরিয়ালস ভেরিফিকেশনের দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমান কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখা যায়, তিনি অত্যন্ত কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন কর্মকর্তা। ফেনী জেলায় সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি ল্যাবরেটরি টেস্ট রিপোর্ট এবং কারিগরি বিষয়গুলো অত্যন্ত সতর্কতার সাথে কাউন্টার সাইন করতেন
২০২৪ সালের বিভিন্ন নথিতে দেখা যায়, তিনি ফেনী এলজিইডির ল্যাব টেকনিশিয়ান শায়ফুল ইসলাম এবং সহকারী প্রকৌশলী ফারিয়া সাররীনদের কাজের কাউন্টার সাইন করতেন । সেখানে তিনি মাটির ঘনত্ব (MDD) এবং আর্দ্রতার (OMC) মতো জটিল কারিগরি বিষয়গুলো তত্ত্বাবধান করেছেন। এর অর্থ হলো, সৌরভ দাস একজন কারিগরিভাবে দক্ষ প্রকৌশলী যিনি জানেন যে লোনা পানি বা নিম্নমানের বালি ব্যবহারে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে । ফেনীতে তার এই অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও চকরিয়ায় এসে এই ধরনের ‘বেসিক’ ভুলগুলো বা অনিয়মগুলো প্রশ্রয় দেওয়া ইঙ্গিত দেয় যে, এই ত্রুটিগুলো অনিচ্ছাকৃত নয় বরং সুপরিকল্পিত। অর্থাৎ, লোনা পানি বা পাতলা ঢালাইয়ের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে তিনি সম্পূর্ণ সচেতন থাকা সত্ত্বেও চকরিয়ায় এসব অনিয়মকে প্রশ্রয় দিয়েছেন, যা তার সততাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের যে হিড়িক পড়েছিল, তাতে স্থানীয় প্রশাসনের অনেকের বিরুদ্ধে নীরবতার অভিযোগ ছিল। সৌরভ দাসের বিষয়েও অভিযোগ উঠেছিল যে, তিনি তার প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে বিশেষ কোনো পক্ষের অনুকূলে কাজ করার চেষ্টা করেছেন অথবা অন্ততপক্ষে নির্বাচনী নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন । এই ধরনের অভিযোগ একজন সরকারি কর্মকর্তার জন্য অত্যন্ত গুরুতর, কারণ এটি রাষ্ট্রের প্রতি তার আনুগত্য এবং নিরপেক্ষতার শপথকে কলঙ্কিত করে।
নির্বাচনী ডামাডোলে অনেক সময় বড় বড় প্রকল্পের টেন্ডার বা কাজ ত্বরান্বিত করে বিশেষ মহলের সুবিধা নিশ্চিত করা হয়। চকরিয়ায় সৌরভ দাসের দীর্ঘকালীন অবস্থান এবং পদোন্নতির পরও পদ না ছাড়া এই রাজনৈতিক-প্রশাসনিক সখ্যের অংশ কি না, তা নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে ।
সৌরভ দাসের দীর্ঘকালীন চকরিয়া অবস্থান এবং পদোন্নতির পরও পদ না ছাড়া ইঙ্গিত দেয় যে, তিনি একটি প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় প্রশাসনিক ও আর্থিক দুর্নীতির রাজত্ব কায়েম করেছেন।
তদন্তের দাবি:
১. পদোন্নতি প্রাপ্তির পরও কেন তিনি দায়িত্ব হস্তান্তর করছেন না, তার জন্য বিভাগীয় তদন্ত।
২. ‘কাশেম ট্রেডার্স’ ও ‘জে. ইন্টারপ্রাইজ’-এর মত ঠিকাদারদের সাথে তার আর্থিক লেনদেনের অনুসন্ধান।
৩. ডুলাহাজারা-বহলতলী সড়কের কারিগরি অডিট করে পুনরায় ঢালাই নিশ্চিত করা।
চকরিয়ার জনগণের ট্যাক্সের টাকায় নির্মিত অবকাঠামো নিয়ে এই ধরনের হরিলুট বন্ধে এলজিইডি-র প্রধান প্রকৌশলী ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কঠোর হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।