• সর্বশেষ

    ‘কলেবরে তোমারই কলরব’

    | বুধবার, ১৭ জুলাই ২০১৯ | পড়া হয়েছে 188 বার

    ‘কলেবরে তোমারই কলরব’

    দুর্নামে সঙ্গিন হয়েছে আমার কলম,
    আদি পৃষ্ঠে লিখে চলে কালি,
    লিখে চলে স্বীকারোক্তিনামা।

    এভাবেই শুরু, এভাবেই ক্রমশ কবিতার নিবিড় গাঢ় অন্ধকারে ডুবে যাবেন পাঠক।

    অবশেষে দেখতে পাবেন, কাব্যভাবনার দুয়ার খুলে দাঁড়িয়ে আছেন আব্দুল্লাহ শুভ্র, হাতে ‘কালো জোছনার লাল তারা’। নতুন ও প্রাণগ্রাহী ৯৬টি কবিতার এ সংকলনে পাঠক নতুন করে নিজেকে আবিষ্কার করতে পারবেন। কবিতাগুলোতে উঠে এসেছে নিজেকে মেলে ধরবার প্রয়াস, যা কবিকে এক নতুন ও অনুভূতিপূর্ণ মাত্রায় তুলে ধরবে।

    শূন্য দশকের কবিতা ও কাব্যচেতনা প্রথম দশকে এসে কিছুটা বাঁক বদলেছে। আর এই বাঁক বদলের ধারাবাহিকতার মাঝে নিজেকে সমর্পণ করেন কবি আর বলে ওঠেন ‘পৃথিবী কী খুলে দিল আজ কামিনীর খিলান’। কবিতার অবকাঠামোগত বিনির্মাণ ও আত্মচেতনে ভরা কবিতাগুলো চোখের পলকে পড়ে ফেলা যায়।

    প্রথাগত বা প্রথাবিরোধী এমন ভাবনায় না যাই। আমরা বরং ভাবি কী নেই এ কবিতাগুলোতে। প্রকৃতি, প্রেম, কাব্যিক ব্যঞ্জনা, নিসর্গপ্রীতি, সরল নৈঃশন্দ্য, ঘৃণা, ক্রোধ, অবদমন, যৌনতা, অবগাহন, শ্লাঘা, চৈতন্যবোধ এবং ‘জাতিস্মর লেখক হয়ে একাত্তরের একফালি নীল কেটে আনি’– এ সবই আছে কবিতায়।

    সরলরৈখিক কবিতাগুলো মানব-অস্তিত্বের আর্তনাদ, বিচিত্র মাত্রা, প্রশ্ন-দীর্ণতা আর প্রস্তাবনা-ভঙ্গিতে ঠাসা। সেই সাথে সমকাল মুখরতা, বিক্ষোভ-মত্ততা কবিতাগুলোর শরীরে দেদীপ্যমান। কবির কাব্যবিশ্বের প্রাথমিক বিশুদ্ধতা এই যে, তাঁর লেখা কবিতাগুলো স্বপ্ন আর বাস্তবতার আকাঙ্ক্ষায় পূর্ণ। পাঠক বুঝবেন, কবিতাগুলো তাদের নিজস্ব ভূমিতেই আত্মচারী, বিস্ময়বোধে নিমগ্ন এবং নিশ্চয়ই স্ববিরোধহীন।

    আব্দুল্লাহ শুভ্র নাগরিক কবি। তবে তাঁর কবিতায় ক্লিশে নাগরিকতা নেই, আছে স্বল্প ও নির্বাহুল্য বর্ণনা। সবুজ প্রকৃতি ও মানুষের প্রতি অদম্য ভালোবাসা ধারণ করেও তিনি চিরন্তন এই নগর-যন্ত্রণাকে আত্মস্থ করেছেন, আপন ভঙ্গিতে- আত্মমগ্নতায়। মাঝে মাঝে নাগরিক কোলাহলে ব্যথিত হন, তবুও মেনে নেন এই রূঢ় বাস্তবতাকে। ওয়ার্ডসওয়ার্থ বা ব্লেকের মতো কবিতায় ছড়িয়ে দেন নান্দনিক সারল্য। নান্দনিক কৌশলে প্রণীত কাব্যিক সুষমায় বলিষ্ঠ তাঁর কবিতাগুলো।

    সামাজিক দায়বদ্ধতা আর রোমান্টিক-মানস নিয়েই তাঁর কবিতা নন্দন-বীক্ষায় উন্মোচিত। শিল্পচেতনা তাঁর প্রার্থিত বিষয়, কিন্তু তা মোটেও বাঙালি জাতিসত্তাকে অস্বীকার করে নয়। কবি তাঁর ব্যক্তিক উপলব্ধি কিছু পরিচিত দৃশ্যের ভেতর গভীর আঙ্গিকচেতনায় নিজের অস্তিত্বের স্পর্শ রেখেই আলোকিত করেন। কবিতার মাধ্যমে উপস্থাপিত সব বিষয়ই আমাদের খুব পরিচিত- তবুও তা নান্দনিক চেতনার এক প্রাণস্পন্দন তৈরি করে।

    কয়েকটি কবিতায় কবি সামাজিক অসম্পূর্ণতাকে আবেগের প্রশ্রয়ে বুনন করে কবিতার শিল্পরূপটিকে নির্ভার করে তোলেন। কবিতার মাধ্যমে সামাজিক সমস্যাকে তুলে ধরলেও কবিতার শিল্পগুণ অক্ষুণ্ন থাকে নন্দনচিন্তায়। কখনও সে চিন্তা প্রতিবাদের, কখনও প্রেমের আবার কখনও-বা ফ্রয়েডীয় দার্শনিক চিন্তায় উদ্বুদ্ধ। তাঁর দুটি কবিতায় ফ্রয়েডীয় ‘লিবিডো-চেতনা’ স্পষ্ট।

    ‘কালো জোছনার লাল তারা’ বইয়ের কবিতাগুলো নারী ও নিসর্গ, কবিতা ও মৃত্যু- রোমান্টিকতার সবগুলো সড়কেই পদচারণা করেছে। রোমান্টিকতার গুণগুলোর কারণে তাঁর কবিতায় নারী যতটা না শরীরী তার চেয়েও বেশি কল্পলোকবাসিনী বা অধরা। তাঁর কবিতায় বিচ্ছেদ এক অদ্ভুত নান্দনিকতা নিয়ে উপস্থিত। এখানে বিচ্ছেদ যেন শিল্পের দায়বদ্ধতা। আর সব শেষে, তাঁর কবিতা যেন রোমান্টিক-মানসের সগৌরব উপস্থাপনা।

    তাঁর কবিতায় শেষ যে বিষয়টি চোখে পড়েছে সেটি হলো, আত্মসুখ-আত্মমগ্নতা বা আনন্দের প্রয়োজনেই নয় কিংবা মনকে সমাজবিচ্ছিন্ন করে কল্পনা বা স্বপ্নের জগতে আটকে রাখাই নয় বরং ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে এক সুতোয় গেঁথে শিল্পচৈতন্যের গাঁথুনি করাই মুখ্য উদ্দেশ্য। ওদিকে, ইতিহাস-চেতনার প্রতিও তাঁর রয়েছে এক নিবিড় দায়বদ্ধতা আর রয়েছে মানবিক বেঁচে থাকার প্রতি সুঠাম অহম।

    অধিকাংশ কবিতায় প্রেম যেন এসেছে বর্ষার মেঘের মতো, বর্ণনা-সুন্দর। প্রেমিক কবি শব্দচয়নে শুধু যে মুন্সীয়ানা দেখিয়েছেন তা নয়, সেই সাথে প্রেমের কবিতাগুলোতে রয়েছে চঞ্চলতা, অভিপ্রায়, বাক-বিভূতি, নৈকট্য, সংশয় আর সংগোপনের অবগাহন। আর তাই, পাঠককে মুগ্ধ করবে তাঁর প্রেমের কবিতাগুলো। প্রিয়তমাকে পাবার বাসনাকে গন্তব্য করে আর বিরহকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়ে তিনি লেখেন…..
    আরব বসন্তের নই,
    মাথিনের দারোগা বাবুও নই।
    প্রেম আমার হতেই হবে।

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত